সত্য সমাচার ডিজিটাল: বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাদের গুরুত্ব কেবল পদ-পদবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম, নৈতিক দৃঢ়তা ও সাংগঠনিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে তারা জাতির ইতিহাসে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেন। বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায় তেমনই একজন নেতৃস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি সাবেক প্রতিমন্ত্রী হলেও প্রকৃত অর্থে একজন দূরদর্শী, সংযত ও পরীক্ষিত রাজনৈতিক সংগঠক, যিনি নানা সংকটময় সময়ে দল ও দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ১৯৫১ সালের ১ নভেম্বর ঢাকার কেরাণীগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জ্ঞানেন্দ্র চন্দ্র রায় এবং মাতা সুমতি রায়। শৈশবকাল থেকেই তিনি সচেতন ও প্রতিবাদী মানসিকতার অধিকারী ছিলেন। পাকিস্তান আমলেই তিনি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং ধীরে ধীরে প্রগতিশীল রাজনৈতিক চেতনার ধারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি জাসদ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং জগন্নাথ হল শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়েই তিনি একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেন।
স্বাধীনতা-পরবর্তী অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশে আমরা অনেকেই খুব কাছ থেকে তার রাজনৈতিক পথচলা প্রত্যক্ষ করেছি। ছাত্রজীবনে তার সঙ্গে অসংখ্য মিছিল-মিটিংয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছে। আমার নিজের রাজনৈতিক জীবনের সূচনাও তার হাত ধরেই। তিনি ছিলেন যুক্তি ও আদর্শনির্ভর নেতৃত্বের প্রতীক, হঠকারিতার নয়। সে কারণেই ১৯৭৫ সালের পর জাসদের রাজনীতি যখন উগ্রতার পথে ধাবিত হয়, তখন তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে অনেকটাই সংযত করেন। কারণ তার বিশ্বাস ছিল—রাজনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য ক্ষমতা নয়, গণমানুষের কল্যাণ।
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠিত হলে তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে যুক্ত হন। একই বছরে যুবদল প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি তাতে যোগ দেন এবং স্বল্প সময়েই সাংগঠনিক দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। পরবর্তীতে তিনি যুবদলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এখান থেকেই বিএনপির রাজনীতিতে তার দীর্ঘ ও ধারাবাহিক অভিযাত্রা শুরু হয়।
১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি টেকনোক্র্যাট কোটায় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে বিশেষ গুরুত্ব দেন। ক্ষমতার মোহ নয়, বরং দায়িত্ব পালনের মধ্যেই তিনি তৃপ্তি খুঁজে পেতেন।
পরবর্তীতে তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এবং পরে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম—স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই পদসমূহ তার অভিজ্ঞতা, আস্থাভাজন নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতার স্বীকৃতি বহন করে।
‘ওয়ান ইলেভেন’ পর্ব ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক কঠিন অধ্যায়। সেই সংকটময় সময়ে বিএনপি যখন ভাঙনের মুখে, নেতৃত্ব সংকটে ও দমন-পীড়নের শিকার, তখন গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দৃঢ়তার সঙ্গে দলের হাল ধরেন। মরহুম হান্নান শাহের সঙ্গে তিনি কার্যত দলের সাংগঠনিক প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। ভয়, প্রলোভন বা চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে তিনি দলের কাঠামো ও মনোবল অটুট রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এই সময় তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাহসী সিদ্ধান্ত ও সংগঠনের প্রতি অবিচল আনুগত্য তাকে দলের ভেতরে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। তিনি প্রমাণ করেন—রাজনীতি শুধু স্লোগান নয়, সংকটে দায়িত্ব নেওয়ার নাম।
বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের ভূমিকা গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি রাজনীতিকে পেশা নয়, বরং আদর্শিক ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি দল ও নীতির প্রতি অবিচল থেকেছেন। তার জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
নিঃসন্দেহে বলা যায়, ইতিহাস তাকে কেবল একজন সাবেক প্রতিমন্ত্রী বা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে নয়, বরং একজন পরীক্ষিত, পরিশীলিত ও দৃঢ়চেতা রাজনৈতিক সৈনিক হিসেবেই স্মরণ করবে।

