নিজস্ব প্রতিবেদক
একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন সাধারণ আইটি কর্মচারীর বিরুদ্ধে ওঠা কোটি টাকার দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পক্ষে খোদ প্রতিষ্ঠানের প্যাড ব্যবহার করে সাফাই গাইলেন প্রধান শিক্ষক। অভিযুক্ত কর্মচারী মোস্তাফিজুর রহমানের পক্ষে মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলামের এমন ‘ব্যক্তিগত’ প্রতিবাদলিপি ইস্যু করার ঘটনায় শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, একজন কর্মচারীর ব্যক্তিগত অনিয়ম, বদলি বাণিজ্য ও অর্থ লোপাটের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের দায় কেন একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজের কাঁধে নেবে? আর প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক প্যাড ও পদবি কি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অপরাধের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়?
নেপথ্যে যে বিতর্ক
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে মনিপুর স্কুলের আইটি ইনজিনিয়ার পদবিধারী মোস্তাফিজুর রহমানের "আলাদিনের চেরাগ" পাওয়ার মতো অবিশ্বাস্য উত্থান নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখানো হয়, ২০১৩ সালে সাধারণ পদে নিয়োগ পেয়ে মাত্র এক দশকে কীভাবে প্রভাব খাটিয়ে তার বেতন ১ লাখ ১৪ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা ওই প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ ও উচ্চশিক্ষিত শিক্ষকদের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। এছাড়া শিক্ষকদের বদলি বাণিজ্য, কম্পিউটার ল্যাবের ভুয়া বিল, চড়া দামে নিম্নমানের সামগ্রী কেনাকাটা এবং ডিজিটাল রেকর্ড ম্যানিপুলেশনের মতো গুরুতর অভিযোগের দালিলিক প্রমাণ উঠে আসে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই গুরুতর ও সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিগত অভিযোগের বিরুদ্ধে অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান নিজে কোনো ব্যক্তিগত প্রতিবাদ জানাননি। উল্টো প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম স্কুলের অফিসিয়াল প্যাড ব্যবহার করে মোস্তাফিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েছেন।
প্রাতিষ্ঠানিক প্যাড ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন
আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল প্যাড এবং প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষর কেবল প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক স্বার্থ, প্রাতিষ্ঠানিক নীতি ও দাপ্তরিক যোগাযোগের জন্য ব্যবহারযোগ্য। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে যদি ব্যক্তিগত দুর্নীতি, অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তবে তার দায় সম্পূর্ণ ওই ব্যক্তির।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক ও অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অভিযোগ উঠেছে মোস্তাফিজের বিরুদ্ধে। স্কুলের ফান্ড লোপাট করে তিনি বাউফলের নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আজ বিলাসী জীবনযাপন করছেন। প্রতিবাদ করলে তিনি নিজের প্যাডে বা আইনজীবীর মাধ্যমে করবেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক কেন সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিধি লঙ্ঘন করে স্কুলের প্যাডে তার সাফাই গাইছেন? এর মাধ্যমে কি প্রমাণিত হয় না যে, এই দুর্নীতির শিকড় আরও গভীরে এবং এতে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারাও জড়িত?
শিক্ষা গবেষক ও আইনজীবীদের মতে, কোনো কর্মচারীর ব্যক্তিগত অপকর্মের পক্ষে প্রতিষ্ঠানের প্যাড ব্যবহার করা স্পষ্টত 'স্বার্থের সংঘাত' এবং পদের অপব্যবহার। যদি তদন্তে মোস্তাফিজের অপরাধ প্রমাণিত হয়, তবে স্কুলের প্যাডে তার পক্ষে সাফাই গাওয়ার কারণে প্রধান শিক্ষকও নৈতিক ও আইনিভাবে এই দুর্নীতির সহযোগী হিসেবে পার পেয়ে যেতে পারেন না।
অন্ধকারে মূল রহস্য: তদন্তের দাবি
অভিভাবক ও সচেতন মহল মনে করছেন, প্রধান শিক্ষকের এই মরিয়া চেষ্টা আসলে মোস্তাফিজকে বাঁচানোর জন্য নয়, বরং মোস্তাফিজের পেছনে থাকা 'প্রশাসনিক সিন্ডিকেট'কে আড়াল করার কৌশল। একজন সাধারণ ডাটা এন্ট্রি অপারেটর কীভাবে সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পে-স্কেল লঙ্ঘন করে বিশেষ ইনক্রিমেন্ট পেলেন, সেই রহস্য উদঘাটন হওয়া জরুরি।
সংশ্লিষ্টরা অবিলম্বে এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একজন কর্মচারীর ব্যক্তিগত দুর্নীতির পক্ষে প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা বিলিয়ে দেওয়ার এই ঘটনা ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) কীভাবে দেখবে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
সম্পাদক:মো: আবু ফাত্তাহ
বেঙ্গল সেন্টার (৬ষ্ঠ তলা) ২৮ তোফখানা রোড ঢাকা-১০০০।
ফোন:০১৬১৮৫১১৫১৭ মেইল: sattyasamacher@gmail.com
Copyright © 2026 sattyasamacher.com. All rights reserved.